সাংস্কৃতিক আগ্রাসন! নাকি আমাদের অসহায় আত্মসমর্পন

Thursday, 20 January 2011

আমাদেরও তো আছে কতো সুন্দর একটি সংস্কৃতি!
সংস্কৃতি বিষয়টা আমার কাছে অনেক গোলমেলে মনে হয়। কারণ, একেক দেশে এটা একেক রকম। এক দেশে হয়তো একটা বিষয় গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে, অন্য কোন দেশে হয়তো ঐ একই বিষয়টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমার কাছে বেশ আশ্চর্যই লাগে। যদিও জানি, ব্যাপারটা স্বাভাবিক এবং অনেক বেশি সাধারণ। মাঝে মাঝেই দেখা যায়, আমরা হঠাৎ করে চিৎকার করে উঠি-“দেশ রসাতলে গেল, দেশ রসাতলে গেল” বলে। যার মধ্যে হয়তো আমিও আছি। হ্যাঁ, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমিও ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা পশ্চিমা সংস্কৃতির ঘোর বিরোধী।
আমিও এ ব্যাপারে অন্য অনেকের মতোই লজ্জিত এবং অনেক ক্ষেত্রে হয়তো বেশ শঙ্কিতও এ ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু, একটা ব্যাপার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। আর তা হলো, আমাদের সংস্কৃতির এ ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার জন্য শুধু কি উপরি উল্লিখিত দেশগুলোর তথাকথিত সংস্কৃতিই দায়ী। আমি প্রায় নিশ্চিত করে বলতে পারি, “না, আজকে আমাদের সংস্কৃতির এই দরিদ্র অবস্থার জন্য আমরা নিজেরাই প্রকৃত অর্থে দায়ী। কিভাবে? রাত দিন হিন্দি সিনেমা দেখে, হিন্দি সিরিয়াল দেখে এবং তথাকথিত স্মার্ট সাজার নাম করে বন্ধু মহলে অনর্গল হিন্দিতে কথা বলে অথবা ফেসবুকে হিন্দিতে স্ট্যাটাস দিয়ে। অনেকেই হয়তো বলবেন, এগুলোর মাঝে অপরাধের কি! আমিও স্বীকার করছি, আসলেও তো এগুলোর মাঝে অপরাধের কি। কিন্তু, অপরাধের প্রশ্ন আসে তখন, যখন দেখি ব্যাপারটা সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। আমরা হিন্দি সিনেমা দেখতেই পারি, কিন্তু তাই বলে বাংলা সিনেমাকে পুরোপুরি বর্জন করে নয়। হ্যাঁ, আমরা হিন্দি সিরিয়ালও দেখতে পারি, কিন্তু তাই বলে, বাংলা বিভিন্ন চ্যানেল এবং এদের মানসম্মত ধারাবাহিকগুলোকে নিষিদ্ধ করে নয়। অনেককে বাংলা সিরিয়ালের নাম শুনতেই মুখে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি ফুটে উঠতে দেখেছি। ভাবটা এমন যেন বাংলা সিরিয়ালে আবার দেখার কি আছে, এরা আবার কিছু পারে নাকি!! অথচ, ভেবে দেখুন, আমাদের দেশেরও তো আছে কত সমৃদ্ধ একটা সংস্কৃতি।

খুব আশ্চর্য হই, যখন দেখি মাঠে খুব ছোট একটা বাচ্চাকে বেডমিন্টন খেলার প্রতিটা সার্ভ করার সময় স্পষ্ট স্বরে “জয় হিন্দ” বলতে (অথচ তার কথাতে এখনো ঠিকমতো জড়তাই কাটেনি) । দেখে মনে হচ্ছিল, বাচ্চাটা না বুঝে শুধুমাত্র খেলার সময় শরীরে জোশ আনার জন্য বারবার “জয় হিন্দ” কথাটা উচ্চারণ করছিল। না দোষ বাচ্চাটার নয়। দোষ, আমরা যারা বড় বলে নিজেদের দাবী করি, তাদের দৃষ্টি ভঙ্গিতে। আমরা যদি আরেকটু সাবধান হতাম, নিজেদের আরেকটু সংযত করে রাখতাম, তাহলে হয়তো আজ আমাদের এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো না। আমরা সবাই জানি, ভারতে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কারণ, আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো ওদের দেশের বাংলা ভাষা-ভাষী অঞ্চলে দেখানো হলে, ওরা আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তে পারে তা ভেবে। ঠিক যেমনি আমরা আমাদের দেশে ওদের চ্যানেলগুলোর বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখে ওদের পণ্যের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করি। ভারত আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো ওদের দেশে বন্ধ করে রেখেছে নিজেদের দেশের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য। না, এটাকে কেউ আমাদের দেশের প্রতি ভারত অন্যায় আচরণ করছে, তা কোনভাবেই বলতে পারবেন না। কারণ, ওরা যাই করেছে বা করছে অথবা ভবিষ্যতে হয়তো যা করবে, তা নিজেদের দেশের কল্যাণের কথা ভেবেই করেছিল, করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। কিন্তু, আমরা কি করছি? আমরা কোন কিছু করার আগে কি নিজের দেশের কথা একবারও ভেবে দেখি। আমরা কি পারি না মাত্র অল্প কিছুদিনের জন্য আমাদের প্রিয় হিন্দি চ্যানেলগুলো দেখা বন্ধ করতে। তাহলে, এক সময় না একসময় ভারত ঠিকই বাধ্য হবে আমাদের দেশের উপর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এবং আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোকে ওদের দেশে দেখানোর অনুমতি দিতে। কিন্তু না, আমরা নিজের দেশের জন্য এতটুকু করতেও সম্মত নই!! এখানেই আমাদের দেশের সাথে ওদের দেশের মানুষের পার্থক্য। ওদের প্রত্যেকটা সিরিয়াল লক্ষ্য করলে দেখতে পারবেন, সিরিয়ালগুলোতে ওরা ওদের ধর্মকে কতোখানি প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকটা হিন্দি মুভি শুরু হয় ওদের ভগবানের আশীর্বাদের মাধ্যমে। আর আমাদের কথা একবার ভেবে দেখেন তো। আমাদের দেশের কয়টা সিরিয়ালে আল্লাহ্‌র নাম বা আমাদের ধর্মের নাম নেওয়া হয়। এখানেই ওরা আমাদের চেয়ে আলাদা। ওরা ওদের দেশকে, ওদের ধর্মকে সর্বোচ্চ গুরত্ব দেয়, যেখানে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। আমার কথাগুলো অনেকের কাছে মূল্যহীন হতে পারে, কিন্তু আমাকে এ ব্যাপারগুলো যথেষ্টই ভাবায়। যদিও এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তা শুধরানোর চেষ্টা করা উচিৎ। মনে রাখতে হবে, সবার প্রথমে আমি এবং আমরা একজন বাংলাদেশী। আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। আমাদের সবারই এ দেশের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা আছে এবং আমাদের সবারই তা যথাযথভাবে পালন করা উচিৎ।

0 comments:

Post a Comment